জবা ফুলের গল্প

                                                                              


 গ্রামটি ছিল সবুজে ভরা, মাটির গন্ধ আর পাখির ডাকে মাখা। এই গ্রামের এক কোণে ছিল একটি পুরনো মন্দির, যা বছরের পর বছর ধরে গ্রামের মানুষদের আস্থা আর বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মন্দিরের চারপাশে ছিল অসংখ্য জবা ফুলের গাছ। লাল, সাদা, গোলাপি, বিভিন্ন রঙের জবা ফুলগুলো যেন মন্দিরের শোভা বাড়াত। গ্রামের মানুষজন প্রতিদিন সকালে মন্দিরে এসে জবা ফুল দিয়ে দেবতাকে পূজা করত।

এই গ্রামেরই এক কোণে বাস করত ছোট্ট মেয়ে কনিকা। কনিকার বয়স ছিল মাত্র আট বছর। সে ছিল খুবই প্রাণবন্ত আর চঞ্চল, কিন্তু তার একটি বড় দুঃখ ছিল—সে কথা বলতে পারত না। কনিকার কথা না বলার জন্য গ্রামের অনেকেই তাকে অবহেলা করত, কেউ কেউ আবার মজা করত তার সাথে। কিন্তু কনিকার মা-মা বাবার কাছে সে ছিল তাদের চোখের মণি। তারা সবসময় চেষ্টা করত কনিকার মন খুশি রাখতে।

                                                                                 


কনিকার সবচেয়ে প্রিয় ছিল মন্দিরের জবা ফুলগুলো। প্রতিদিন সকালে সে মন্দিরে যেত এবং সেখান থেকে একটি বা দুটি জবা ফুল তুলে বাড়ি ফিরত। এই ফুলগুলো তার কাছে ছিল খুবই মূল্যবান। সে তার ছোট্ট ঘরের এক কোণে রাখা একটি মাটির কলসিতে ফুলগুলো যত্ন করে রাখত।

মন্দিরের পুরোহিত মহাশয়, যিনি ছিলেন একজন বৃদ্ধ কিন্তু স্নেহশীল ব্যক্তি, তিনি কনিকাকে খুব পছন্দ করতেন। কনিকাকে দেখে তিনি সবসময় হাসিমুখে বলতেন, “কনিকা, তুমি তো আমাদের মন্দিরের দেবীর প্রিয়, তোমার হাতের ছোঁয়ায় এই জবা ফুলগুলো যেন আরও সুন্দর হয়ে ওঠে।” কনিকা মিষ্টি হাসি দিয়ে মাথা নাড়ত, কিন্তু কিছু বলত না। পুরোহিত জানতেন যে কনিকা কথা বলতে পারে না, তবুও তিনি তার সাথে কথা বলতেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, কথা বলার চেয়ে অনুভূতিই সবচেয়ে বড়।

                                                                            


একদিন সকালে কনিকা যখন মন্দিরে ফুল তুলতে গেল, সে দেখতে পেল যে একটি ছোট্ট জবা ফুলের গাছ মাটিতে নুয়ে পড়েছে। গাছটির পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে, আর তার ওপরের ফুলগুলোও ম্লান হয়ে যাচ্ছে। কনিকা খুবই দুঃখ পেল। সে তাড়াতাড়ি মন্দিরের কাছে গিয়ে পুরোহিতকে জানাল। পুরোহিত এসে গাছটি দেখে বললেন, “এই গাছটি অনেক পুরনো হয়ে গেছে, তাই হয়তো এর এমন অবস্থা। তবে তুমি চাইলে এটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে পার।”

কনিকা তখন সিদ্ধান্ত নিল যে সে এই গাছটি বাঁচানোর জন্য যা কিছু করার দরকার, তা করবে। সে প্রতিদিন সকালে উঠে প্রথমেই গাছটিকে পানি দিত। গাছটির আশপাশের মাটি পরিষ্কার করত, পোকামাকড় যাতে গাছটিকে ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য পাতা ঝেড়ে দিত। কনিকা গাছটির সাথে কথা বলত, তার ছোট্ট হৃদয়ের সব অনুভূতি গাছটির কাছে প্রকাশ করত। সে বিশ্বাস করত, গাছটি তার কথা শুনতে পারে, তার অনুভূতিগুলো বুঝতে পারে।

                                                                                 


কিছুদিন পর গাছটির অবস্থা ধীরে ধীরে ভালো হতে লাগল। কনিকার যত্ন আর ভালোবাসায় গাছটির পাতাগুলো আবার সবুজ হতে শুরু করল, আর নতুন নতুন কুঁড়ি আসতে লাগল। একদিন সকালে কনিকা দেখতে পেল যে গাছটিতে একটি সুন্দর লাল জবা ফুল ফুটেছে। সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ল। তার বিশ্বাস ছিল যে এই জবা ফুল তার পরিশ্রমের ফল। সে ফুলটি তুলে মন্দিরের দেবীর চরণে অর্পণ করল, তার নিরব প্রার্থনা জানাল।

এদিকে গ্রামের মানুষজনও এই পরিবর্তন লক্ষ্য করল। তারা দেখতে পেল যে কনিকার হাতে গাছটি আবার নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে। তারা পুরোহিতের কাছ থেকে সব কথা শুনে খুবই মুগ্ধ হল। তারা বুঝতে পারল, কনিকাই সেই মেয়ে, যাকে তারা অবহেলা করেছিল, কিন্তু তার ভালোবাসা আর নিষ্ঠা গাছটিকে নতুন জীবন দিয়েছে। গ্রামের মানুষজন তখন থেকে কনিকাকে আরও ভালোবাসতে লাগল। তারা তাকে আর অবহেলা করত না, বরং তার প্রতি শ্রদ্ধা আর স্নেহ দেখাত।

পুরোহিত মহাশয় একদিন কনিকাকে ডেকে বললেন, “কনিকা, তুমি শুধু এই গাছটিকে নয়, আমাদের সকলের হৃদয়কেও বাঁচিয়ে তুলেছ। তোমার ভালোবাসা আমাদের সবাইকে শিখিয়েছে কীভাবে জীবনের প্রতিকূলতাকে জয় করতে হয়।” কনিকা তার দিকে তাকিয়ে হাসল, তার চোখে ছিল আনন্দের অশ্রু।

কনিকার এই ভালোবাসা এবং যত্নশীলতা ধীরে ধীরে পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। গ্রামের প্রতিটি মানুষ তার গাছপালা, পশুপাখি এবং এমনকি একে অপরের প্রতি আরও যত্নশীল হয়ে উঠল। মন্দিরের জবা ফুলের গাছটি একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়াল ভালোবাসা, অধ্যবসায় এবং নিঃশব্দ অনুভূতির, যা মানুষকে একত্রে বেঁধে রাখতে পারে।

সময় গড়িয়ে গেল, কিন্তু কনিকার গল্পটি থেকে গেল। তার সেই ছোট্ট জবা ফুলের গাছটি তখন বড় হয়ে অনেক ফুলে ভরে গিয়েছিল। কনিকা বড় হলেও তার মনের সরলতা এবং ভালোবাসা একই রকম রয়ে গিয়েছিল। সে প্রতিদিন মন্দিরে যেত, এবং সেই গাছটির সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটাত।

কনিকার গল্পটি তার গ্রামের সীমা ছাড়িয়ে আশেপাশের গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। সবাই জানত, কনিকা ছিল সেই মেয়ে যে তার ভালোবাসা দিয়ে একটি মরা গাছকে বাঁচিয়ে তুলেছিল। তার গল্পটি ছিল একটি প্রেরণার উৎস, যা সবাইকে শেখাত জীবনের প্রতিকূলতা জয় করার পথ।

এভাবেই কনিকা আর জবা ফুলের গল্পটি হয়ে উঠল এক ধ্রুপদী কাহিনী, যা মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিল। কনিকাকে আর কেউ কখনো অবহেলা করেনি; বরং সে হয়ে উঠল গ্রামের সবার প্রিয়। আর সেই জবা ফুলের গাছটি হয়ে রইল এক অনুপ্রেরণার প্রতীক, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষকে ভালোবাসার পাঠ শেখাতে থাকবে।

Comments

Popular posts from this blog

মল্লিকা ফুলের গল্প